পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস হল একটি স্নায়ুবিক রোগ বিশেষ। শরীরের কোন পেশী বা কোন অংশকে যখন ইচ্ছে মতো নড়ানো যায় না তখন তাকেই বলা হয় পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিসএই রোগ অন্যান্য সমস্ত রোগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও জটিলআমার মতে, প্রকৃতিতে যতো রোগের সাথে আমরা পরিচিত তার মধ্যে সব থেকে ভয়ঙ্কর হল এই রোগটিই। কারণ এই রোগ হওয়ার মানেই হল একটি সচল প্রাণী একটি জড় পদার্থে পরিণত হওয়াকয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত স্বাধীনতা হারিয়ে নিজের শরীরে নিজেই বন্দী হয়ে যাওয়া। এক নম্বর আসামি হয়ে নিজের শরীরে নিজেই শিকলের বাঁধনে কারারুদ্ধ হয়ে থাকা, স্বেচ্ছায় না ঘুরতে পারা যায় না ফিরতে পারা যায় দেহাঙ্গে একটি মশা বসলে তাঁকে দূর করার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে যায়। মশাটি যদিও আপনার শরীরের সমস্ত রক্ত পান করে নেই তবুও আপনি অসহায়। আপনকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে সমস্ত কিছু সহ্য করতে হবে। এর থেকে বড় দুরাবস্থা আর কি হতে পারেকি ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা ! যারা এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছে বা যারা এমন পরিস্থিতিতে আছে তারাই জানে কি নির্মম যন্ত্রণা এটি। প্যারালাইসিস ছাড়া আরও তো এমন বীভৎস রোগ আছে যা মানব জীবনকে ছাড়কাড় করে দিতে পারে। যেমন – ক্যানসার, ডায়াবেটিক, হার্ট ডিজিজ, অ্যালঝাইমার, কিডনি ফেলিওর ইত্যাদি। কিন্তু এরা সবই মানব চরিত্রকে মানব পর্যায়ে রাখে তাকে বস্তু পর্যায়ে নিয়ে যায় না কিন্তু একবার প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া মানেই হল সেই সচেতন মানুষটি এক অচেতন বস্তু জগতে হারিয়ে যাওয়াতার শরীরে যেমন পরিবর্তন আসে তেমনই পরিবর্তন আসে তার স্বভাব চরিত্রেও। কেও চলতে পারে না, কেও বলতে পারে না, কারও একদিক অসার, কারও বা পুরো শরীরই অসার, কেও কথা বলতে বলতে হাসে, কাঁদে, রেগে উন্মাদের মতো চিৎকার করতে থাকে। তবে এরা কেও কিন্তু কোন রকম মানসিক বিকারগ্রস্থ নয়, প্রত্যেকের চিন্তা শক্তি, স্মৃতি শক্তি সব কিছু ঠিক থাকে। তারা আগে যা কাজ করতে পারত তা সবই তাদের স্মৃতির মধ্যেই থাকে কোন কিছু বাইরে চলে যায় না। মনে হতে পারে তারা যেন সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছে, কিন্তু আসলে না, তারা জানে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, হিসাবের খাতা থেকে তারা খুঁজে বের করতে পারে কোথাই কি ভুল ভ্রান্তি হয়েছে। আসলে সমস্যা হল তারা নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করার সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এই রোগের মূল কারণ কি তা বুঝার আগে আমরা যদি নিজেদের দিকে একবার লক্ষ করি তবে দেখতে পাবো আমাদের সমস্ত মানসিকতা বা ইমশন কোন না কোন কেমিক্যাল কো-অরডিনেটর বা হরমোনের উপর নির্ভরশীল। যেমন – নর-অ্যাড্রিনালিন হরমোন প্রয়োজন আমাদের সর্তক হওয়ার জন্য, ডোপামাইন আমাদের উৎসাহ দেই, অক্সিটসিনকে বলা হয় ভালোবাসার হরমোন, অ্যাসিটিকোলাইন সমস্ত নার্ভ সিস্টেমের উপর কাজ করে, এন্ডরফিন পুরো শরীরে ব্যাথা ছড়িয়ে পড়তে প্রতিরোধ গঠন করে, সেরিটনিন আমাদের মনে আনন্দের সঞ্চার করে। এই সমস্ত বেশীর ভাগ হরমোনের উৎস হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক। পিটুইটারি হরমোন হচ্ছে মাস্টার গ্ল্যান্ড, এখানে সমস্যা হওয়া মানে হল পুরো শরীরের অন্যান্য যে সমস্ত গ্রন্থি আছে তাতেও সমান সমস্যা তৈরি হওয়া। এই পিটুইটারি মাস্টার গ্ল্যান্ডে সমস্যা তখনই দেখা দেয় যখন ব্রেন স্ট্রোক বা মস্তিস্ক কোন ভাবে আঘাতগ্রস্থ হয়। মস্তিষ্কের ভেতর কোন রক্ত নালী ফেটে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে এমন অভিঘাত দেখা দেয়সাধারণত একবার ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার পরেই প্যারালাইজ হয়। ব্রেন স্ট্রোক মানে হল, ব্রেনে হয় কোন রক্ত নালী ফেটে গেছে না হয় কোন রক্ত নালী বন্ধ হয়েগেছে। যার দরুন ব্রেনে যে নিউরনগুলো আছে তাতে অক্সিজেন, পুষ্টি, জল কিছুই পৌছাতে পারছে নাএর ফল স্বরূপ তারা মরতে শুরু করেছে। ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার পরে রুগী প্রথমে জ্ঞান হারায়, কখনো কোমার পর্যায়ে যায়, তারপরে যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন সে পুরো বা অর্ধ পক্ষাঘাত গ্রস্থ হয়ে পরে। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন অনুসারে প্যারালাইজ হল আমাদের কেন্দ্রিয় স্নায়ু তন্ত্রের একটি সমস্যা যার ফলে হাত নাতো পা চালনা করতে সমস্যা দেখা দেয়। প্রতি বছর ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ লোক প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয় কেবল স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির জন্য। ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্তের সংখ্যা এর থেকে অনেক বেশি। এটি ইতিমধ্যে একটি মহামারীর অনুপাতে পৌঁছে গেছে, যা এই অধুনিক মানব সমাজের কাছে একটি ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেকারণ এমন অনুমান করা হচ্ছে যে বিশব্যাপী ২৫ ঊর্ধ্ব ৪ জনের মধ্যে ১ জন তাদের জীবদ্দশাতেই ব্রেন স্ট্রোক করবে ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের একটি হিসেব অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ কোটি লোক ইতিমধ্যে ব্রেন স্ট্রোকের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। যাদের মধ্যে ৬০% লোকের বয়স ৭০ এর মধ্যে ও ১৬% লোকের বয়স ৫০ এর মধ্যে এই চলতি বছরেই বিশ্বব্যাপী হয়ত ১.২২ কোটি লোক প্রথম ব্রেন স্ট্রোকে অক্রান্ত হবে ও এর মধ্যে থেকে ৬৫ লক্ষ লোকে মারা যাবে। আর যারা বাকি থাকলো তারা প্যারালাইসিস হয়ে বাকি জীবন কাটাবে। এই সংস্থার মতে এমন স্ট্রোকের মূল কারণই হল অ্যাথেরস্ক্লেরসিস যার সাধারণ অর্থ হল রক্ত নালীতে ফ্যাট ও এই জাতিয় অন্যান্য উপাদান জমে যাওয়া, যাকে প্লাক বা ফলক বলা হয়। যার পরিণাম স্বরূপ দেখা দেয় উচ্চ রক্ত চাপ। এর সাথে আরও কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর হল অতিরিক্ত মাত্রায় তামাক ও মাদক দ্রব্য সেবন, কম শারীরিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, হৃদয় যন্ত্রে রক্ত চাপ বাড়া, রক্তে লিপিডের মাত্রা বাড়ে যাওয়া, মেদবৃদ্ধি, কিছু জন্মগত সমস্যা আর মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা সমূহ। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের একটি পরিসংখ্যান অনুসারে জানা যায় সারা বিশ্বে বাৎসরিক ১.৫ লক্ষ লোক স্ট্রোকে আক্রন্ত হয়। যার মধ্যে ৫০ লক্ষ লোক মারা যায় এবং ৫০ লক্ষ লোক স্থায়ী ভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে তারা নিজের পরিবার নাতো সমাজের উপর বোঝা স্বরূপ হয়ে দ্বারায়। সাধারণত ৪০ বছরের নীচে এমন স্ট্রোক হওয়া খুবই অস্বাভাবিক কিন্তু বর্তমান সময়ে এমনও হতে দেখা যাচ্ছে যার মূল কারণই হল উচ্চ রক্ত চাপ। দেখা গেছে স্ট্রোকে মারা যাওয়া প্রতি ১০ জন ব্যক্তির মধ্যে ৪ জনকে বাঁচান সম্ভব হত যদি তদের উচ্চ রক্ত চাপকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত আবার সারা বিশ্বে ৮% বাচ্চাদের এমন স্ট্রোক হওয়ার মূল কারণ খুঁজে পাওয়া যায় একটি বিশেষ রক্ত কণিকার জন্য যার নাম সিকেল রেড ব্লাড সেল।



 আসলে এমন রক্ত কণিকা যদি বেড়ে যায় তবে রক্ত নালী খুব তাড়াতাড়ি ব্লক হতে শুরু করে। যার ফলে এমন স্ট্রোক দেখা দেয়। ৬৫ বছরের মধ্যে যাদের বয়েস তাদের বেশীর ভাগ স্ট্রোক হওয়ার মূল কারণই হল ক্রমাগত ধূমপান করা ২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের একটি সমীক্ষা থেকে আরও কতোগুলো অবাক করা তথ্য জানা যায় তা হল সারা বিশ্বব্যাপী যতো স্ট্রোক হয় তার ৬০%-এর বয়স ৭০ বছরের মধ্যেই থাকে, ৮%-এর বয়স থাকে ৪৪ বছরের মধ্যে, ৫২% হয় পরুষের এবং ৪৮% হয় মহিলার২০১৬ সালে প্রায় ৯৫ লক্ষ আইসিমিক স্ট্রোকের নতুন কেশ পাওয়া যায়। যাদের মধ্যে ৬০%-এর বয়স ৭০ এর মধ্যে, ৭%-এর বয়স ৪৪ বছরের মধ্যে, ৫২% পুরুষ ও ৪৮% মহিলা ছিল২০২০ সালে সারা বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৫ কোটি হেমারেজ স্ট্রোকের খবর পাওয়া যায়যাদের মধ্যে ৬৭%-এর বয়স ছিল ৭০ বছরের মধ্যে, ১৫%-এর বয়স ছিল ৪৪ বছরের মধ্যে আর পুরুষ ছিল ৪৯% এবং মহিলা ছিল ৫১%বর্তমানে সারা বিশ্বে ডায়াবেটিক রুগীর সংখ্যা প্রায় ৩৮.৩ কোটিযাদের মধ্যে পুরুষ ৫২% ও মহিলা ৪৮%ইনাদের মধ্যে বেশীর ভাগই ভবিষ্যতে আইসিমিক নাতো হেমারেজ স্ট্রোকে আক্রান্ত হবেনসারা বিশ্বব্যাপী স্ট্রোকে আক্রান্তের এমন ভয়াবহতা দেখে প্রতি বছর ২৮ অক্টবর দিনটিকে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস হিসাবে উৎযাপন করা হয়। ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের মতে এমন স্ট্রোকের পেছনে আমাদের জীবনে কতগুলো রিক্স ফ্যাক্টর কাজ করে যেমন –


. ডায়েট্রি রিক্স ফ্যাক্টর - ৫১.১%

. উচ্চ বি.এম.আই - ২৩.৬%

. ধূমপান – ২৩.৪%

. উচ্চ ফাস্টিং গ্লুকোজ – ১৭.৩%

. মাদক দ্রব্য সেবন – ১১.৯%

. উচ্চ এল.ডি.এল কোলেশট্রল – ১০%

. কিডনির কাজ বিকল হয়ে যাওয়া – ৮.৬%

. কম শারীরিক পরিশ্রম – ৪.৫%  

 

সারা বিশ্বের সাথে ভারতের অবস্থা একটু বেশি সঙ্গিন। ভারতের একজন বিশিষ্ট নিউরলজিস্ট ডঃ গৌরভ জৈন জানান স্ট্রোক ভারতে একটি নতুন মহামারীর রূপ ধারণ করেছে, প্রতি বছর প্রায় ১৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ স্ট্রোকের নতুন মামলা সামনে আসে। এই পরিসংখ্যানটা হয়ত আরও বেশি হবে কারণ ভারতে সমস্ত রুগী সমান স্বাস্থ্যের পরিষেবা পায়না। ভারতে প্রতিদিন প্রায় ৪০০০ লোকে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে ২ থেকে ৩ শতাংশরই চিকিৎসা ঠাকঠাক হয়ে থাকেসারা বিশ্বের ৬০ শতাংশ স্ট্রোক পেসেন্ট ভারতেই আছে। তিনি আরও বলেন, স্ট্রোকের চিকিৎসা যদি সময় মতো না হয় তবে সেই ব্যাক্তি প্যারলাইজ হয়ে সারা জীবন শয্যাশায়ী হতে পারে নতুবা মৃত্যুর দিকে এগতে থাকেভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের একজন ব্যাক্তি উন্নত দেশের একজন ব্যাক্তির তুলনায় ৩৫ বছর আগেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।  

Pages